খেলা হচ্ছে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত বিষয়। বড়ো খেলার মাঠ বা আঙিনা না থাকলে খেলাধুলা করা যাবে না- এ ধারণা ঠিক নয়। ঘরের ভেতর বসেও বিভিন্ন রকম খেলাধুলা করা যায়। সাধারণত ঘরে বসেই যেসব খেলা হয় তাকেই ঘরোয়া খেলা বা ইনডোর গেমস বলে। যেমন- দাবা, ক্যারম, লুডু ইত্যাদি।
দাবা: দাবা খেলার জন্ম কোন দেশে এ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। কেউ বলে ভারতে, কেউ বলে পারস্যে আবার কেউ বলে চীন দেশে। তবে বেশির ভাগই বলে, দাবা খেলার কোর্ট বা ছক আবিষ্কার করেন হানসিং নামক একজন চীনা লোক। দাবা বর্তমান যুগে চমকপ্রদ এক বুদ্ধির খেলা।
দাবা বোর্ড: দাবা বোর্ড ৬৪টি সম-আকৃতি বর্গক্ষেত্র নিয়ে গঠিত। বোর্ডের ক্ষেত্রগুলো সাদা ও কালো রং দিয়ে একের পর এক ধারাক্রমে সজ্জিত। বোর্ডের সাদা ঘর খেলোয়াড়দের ডান দিকে থাকবে। খেলা আরম্ভের সময় একজন খেলোয়াড়ের ১৬টি সাদা এবং অপরজনের ১৬টি কালো রঙের ঘুঁটি থাকে। ঘুঁটিগুলোর মধ্যে ১টি রাজা, ১টি মন্ত্রী, ২টি নৌকা, ২টি হাতি, ২টি ঘোড়া, ৮টি বোড়ে বা পণ থাকে।

দাবার চাল: এক ঘর থেকে অন্য ঘরে খুঁটির স্থান পরিবর্তনকে দাবার চাল বলে। প্রথমে কে চাল দেবে তা টস্ করে ঠিক করতে হয়। যে সাদা ঘুঁটি নেবে সে প্রথমে চাল দেবে। দাবার ঘুঁটির চালগুলো বিভিন্ন ধরনের। এবার ওদের চালাচালি সম্বন্ধে নিম্নে আলোচনা করা হলো-
রাজা: রাজা তার ডানে-বামে, সামনে-পেছনে অর্থাৎ সবদিকে এক ঘর যেতে পারে।
মন্ত্রী: বোর্ডের ওপর মন্ত্রীর শক্তি সবচেয়ে বেশি। বোর্ডের একটি নৌকা ও গজ বা হাতির শক্তির সমান। মন্ত্রী নৌকার মতো ডানে-বামে এবং গজের মতো কোনাকুনি চলতে পারে। সামনে ঘুঁটি খেয়ে ঘর দখল করতে পারে। মন্ত্রীর মান নয় (৯)।
নৌকা: ডানে-বামে অথবা সামনে-পেছনে নৌকা সোজা পথে চলে। কোনো ঘুঁটি ডিঙিয়ে যেতে পারে না। তবে চলার পথে কোনো ঘুঁটি থাকলে তা খেয়ে ওই ঘর দখল করতে পারে। নৌকার মান ছয় (৬)।
গজ বা হাতি: গজ কোনাকুনি চলে। কালো ঘরের গজ কালো ঘর দিয়ে, সাদা ঘরের গজ সাদা ঘর দিয়ে চলতে পারে। গজের মান তিন (৩)।
ঘোড়া: ঘোড়া সামনে পেছনে, ডানে-বামে এক্কেবারে আড়াই ঘর লাফাতে পারে। নিজ বা বিপক্ষের ঘুঁটির ওপর দিয়ে ডিঙিয়ে যেতে পারে। ঘোড়ার মান তিন (৩)।
বোড়ে বা সৈনিক: বোড়ে হলো রাজার সৈনিক। এটি প্রথম চালে ইচ্ছা করলে দুই ঘর যেতে পারে। পরবর্তী চালগুলো এক ঘর করে এগিয়ে যাবে। অন্যসব ঘুঁটি পেছনে সরিয়ে আনা যায় কিন্তু বোড়ে কখনোই পেছনে চালা যায় না। বোড়ের মান এক (১)। বোড়ে কোনাকুনি একঘর সামনের ঘুঁটি খেতে পারে।
ক্যাসলিং: কিস্তি বাঁচানোর জন্য রাজা ও নৌকার মধ্যে জায়গা বদলের যে চাল দেওয়া হয় তাকে ক্যাসলিং বলে।
খেলার নিয়ম: প্রথমে সাদা বোড়ে ১ ঘর বা ২ ঘর চালতে পারে। বোড়ে বাদে ঘোড়াও চালা যায়।
তারপর বিপক্ষের চালের অবস্থা বুঝে চাল দিতে হয়। যদি কোনো বোড়ে শেষ প্রান্তে বা ৮ নং ঘরে পৌঁছায় তাহলে উক্ত বোড়ের পদোন্নতি হয়ে মন্ত্রী, নৌকা, হাতি, ঘোড়া যেকোনো ঘুঁটি হবে। রাজাকে কখনো চালমাত করা যায় না। চালমাত অর্থ হলো রাজা বিপক্ষের খুঁটির শক্তির কিস্তির মুখে নেই অথচ চালও দিতে পারছে না। এভাবে খেলতে খেলতে যার রাজা আটকে যাবে সে পরাজিত হবে।
| কাজ-১: ইনডোর গেমস কাকে বলে? ইনডোর গেমসে কি কি খেলা হয় তা লিখ। কাজ-২: দাবা খেলতে কী কী সরঞ্জামের প্রয়োজন হয়? এর তালিকা তৈরি কর। |
ক্যারম: ক্যারম খেলা অভ্যন্তরীণ ক্রীড়ার অন্তর্ভুক্ত অর্থাৎ ঘরে বসে সহজে আনন্দ লাভের জন্য ক্যারমের জুড়ি মেলা ভার। একক ও দ্বৈত দুভাবেই ক্যারম খেলা যায়।
ক্যারম বোর্ড: বোর্ডটি বর্গাকার হয়ে থাকে। বোর্ডের উপরিভাগ হয় সমতল ও খুবই মসৃণ। বোর্ডের চার কোনায় চারটি গোলাকার পকেট থাকে। বোর্ডের মাঝখানে একটি বৃত্ত থাকে, এর ভিতর ঘুঁটি বসাতে হয়।
ঘুঁটি: ক্যারম খেলার ঘুঁটি ৯টি সাদা, ৯টি কালো এবং ১টি লাল রঙের। প্রত্যেকটি খুঁটি আকারে ও ওজনে একই রকম হবে।

স্ট্রাইকার: ক্যারম খেলার ঘুঁটিগুলোকে আঘাত করে পকেটে ফেলার জন্য ওজনে ও আকারে বড়ো একটি বৃত্তাকার ঘুঁটি ব্যবহার করা হয় যাকে স্ট্রাইকার বলে।
ক্যারম খেলার জন্য উন্নতমানের বোরিক পাউডার ব্যবহার করতে হবে যাতে বোর্ডের উপরিভাগ মসৃণ ও শুকনো থাকে।
স্ট্রাইক করার নিয়ম
ক. স্ট্রাইকারে আঙুল দিয়ে আঘাত করতে হবে, ধাক্কা দেওয়া যাবে না।
খ. যে হাত দিয়ে খেলবে সেই হাতের কনুই বোর্ডের উপরিভাগে আসতে পারবে না।
ব্রেক: বোর্ডে প্রথম আঘাতের আগে সেন্টার সার্কেলে রেড বসিয়ে তার চারদিকে পর্যায়ক্রমে সাদা ও কালো ঘুঁটি বসাতে হবে। প্রথম স্ট্রাইক করার জন্য যে খেলোয়াড়কে (টসের মাধ্যমে) নির্ধারণ করা হয়েছে সেই ব্রেক নেবে। ব্রেক গ্রহণকারী খেলোয়াড় সাদা ঘুঁটি এবং বিপক্ষ কালো ঘুঁটি নিয়ে খেলবে। এভাবে পালাক্রমে ব্রেক গ্রহণ চলতে থাকবে। রেড থাকবে উভয় দলের জন্য সাধারণ।
স্কোরিং পদ্ধতি
ক. ২৫ পয়েন্টে এক গেম হবে। যে খেলোয়াড় সর্বপ্রথম ২৫ পয়েন্ট অর্জন করবে সে বা সেইপক্ষ জয়লাভ করবে।
খ. ঘুঁটি এবং রেড-এর মান বা পয়েন্ট হচ্ছে যথাক্রমে ১৩৩।
গ. কোনো খেলোয়াড় কোন বোর্ডে জয়লাভ করলে ওই বোর্ডে বিপক্ষের যত ঘুঁটি থাকবে সে তত সংখ্যক পয়েন্ট অর্জন করবে। কভারিংসহ যদি সে রেড পকেটে ফেলতে পারে তাহলে অতিরিক্ত ৫ পয়েন্ট লাভ করবে। ২৪ পয়েন্ট অর্জনের পর রেডের পয়েন্ট যোগ হবে না।
ঘ.রেড পকেটে ফেলার পর কভারিংয়ের এর জন্য তাকে আর একটি স্বীয় রঙের ঘুঁটি পকেটে ফেলতে হবে।
ঙ. তিন গেমের মধ্যে যে পক্ষ সর্বাধিক অর্থাৎ দুই গেমে জয়লাভ করবে সে বিজয়ী ঘোষিত হবে।
| কাজ-১: ক্যারম খেলার নিয়মাবলি বোর্ডে উপস্থাপন কর। |